এম. এ. হোসাইন,
ইতিহাসের কিছু পুনরাবৃত্ত ধারা আছে, যা কখনো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে না। এটি নিঃশব্দে আসে — ন্যায়ের ভাষায় মোড়ানো, তরুণদের অভিযোগে সাজানো, এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রশংসার আলোয় নিজেদের বৈধতা নির্মাণ করে। যে সময়ে কোনো রাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে সে আসলে কীসের মুখোমুখি হয়েছে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণ ততক্ষণে অস্থিতিশীলতার অবকাঠামো রাষ্ট্রের ভেতরেই শক্ত ভিত্তি গড়ে ফেলেছে।
বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তা ছাত্রদের দিয়ে শুরু হয়নি; চাকরির কোটাব্যবস্থার প্রশ্নে শেষও হয়নি। এর পেছনে ছিল আরও গভীর পরিকল্পনা, এমন সকল কৌশলবিদ, যারা জানেন—সবচেয়ে টেকসই বিপ্লব সেই বিপ্লব, যেটিকে জনগণ নিজের সৃষ্টি বলে বিশ্বাস করে। এ ধারণা নতুন নয়। ১৯২৮ সালে জনমত-প্রকৌশলের জনক এডওয়ার্ড বার্নেইস বিষয়টি সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে তেহরানে সিআইএ তা প্রয়োগ করেছিল। ২০১৪ সালে কিয়েভেও অনুরূপ প্রক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। নতুন যা, তা হলো এর গতি, ব্যাপ্তি এবং প্রযুক্তিগত পরিশীলন। আজকের বিশ্বে, বিশেষত বৈশ্বিক দক্ষিণে, এই কৌশল অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও কার্যকর রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়াও এর বাইরে নয়।
বাংলাদেশ দিয়েই শুরু করা যাক, কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শিক্ষণীয় কেস স্টাডি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন খুব দ্রুত এমন এক রূপ নেয়, যা কেবল স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। কোটাব্যবস্থা নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ বাস্তব ছিল। ক্ষোভও ছিল সত্যিকার। কিন্তু প্রায় সব বড় রাজনৈতিক প্রকৌশলের সূচনাই ঘটে এমন বাস্তব অসন্তোষকে কেন্দ্র করেই। পরজীবী যেমন জীবন্ত দেহে আশ্রয় নেয়, তেমনি রাজনৈতিক অপারেশনও প্রকৃত ক্ষোভকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করে।
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ছিল আন্দোলনকারীদের একটি অংশের ‘রাজাকার’ পরিচয়কে গ্রহণ করার প্রবণতা। বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে ‘রাজাকার’ শব্দটি ১৯৭১ সালের গণহত্যার সহযোগীদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফলে এই অভিধাকে প্রত্যাখ্যান না করে বরং রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল একটি যোগাযোগ-কৌশল, একটি প্রতীকী বার্তা।
পরবর্তী সময়ে আরও নানা স্তর উন্মোচিত হতে থাকে। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, বিভিন্ন মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং সংগঠিত ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সদস্যরা ধীরে ধীরে আন্দোলনের ভিড়ে মিশে যেতে থাকে। তারা নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় আড়াল করে বৃহত্তর জনতার অংশ হয়ে উঠে। এ কৌশল নতুন নয়। ২০১১ সালের মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়ও মুসলিম ব্রাদারহুড প্রথমে পেছনের সারিতে অবস্থান করেছিল। উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীরা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হয়েছিল ব্রাদারহুড। ধৈর্য ও সময়—এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল অর্থের প্রবাহ। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তর আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এই অর্থায়ন শনাক্ত করতে বিশেষ তদন্ত প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন পশ্চিমা কূটনীতিক ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। টেলিভিশন টকশো, ইউটিউব চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা প্ল্যাটফর্ম একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে ক্রমাগত শক্তিশালী করতে থাকে। প্রশ্ন হলো—এটি কি কেবল সাংবাদিকতা, নাকি আরও বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র নির্মাণের অংশ?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ ছিল স্নাইপার অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি নিয়ে। কিছু প্রতিবেদনে সাবেক সামরিক সদস্য এবং বিদেশি নেটওয়ার্ক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করে। দায় চাপানো হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর। ফলে রাষ্ট্রের বৈধতা দ্রুত প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে।
যারা শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিরপেক্ষভাবে অধ্যয়ন করেছেন, তাদের কাছে এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়। ১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের আগে সিআইএ শুধু সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগই করেনি; তারা বিরোধী সংবাদমাধ্যমকে সহায়তা, ধর্মঘটকে উৎসাহ এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছিল বলে বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। ১৯৫৩ সালের ইরানে ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’-এর সময় ভাড়াটে জনতা, কৃত্রিম সংবাদ এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ইউক্রেনের ময়দান আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থাকলেও, পশ্চিমা এনজিও অর্থায়ন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সম্পৃক্ততা এবং ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের আলোচিত টেলিফোন আলাপ নতুন প্রশ্নও উত্থাপন করেছিল। এসব ঘটনা কোন কল্পকাহিনী নয়; ইতিহাসের নথিভুক্ত অধ্যায়।
তবে প্রযুক্তি বদলেছে। নগদ অর্থভর্তি স্যুটকেসের জায়গা নিয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। রেডিও ফ্রি ইউরোপের জায়গায় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। সরাসরি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বদলে এসেছে এমন অপারেটিভ, যাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করা সহজ। কিন্তু উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত—যে সরকার বৃহৎ কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাকে দুর্বল করা এবং বিকল্প শক্তিকে ক্ষমতার পথে এগিয়ে দেওয়া।
ভারতে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু এনজিওকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ভারত সরকার বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন ব্যবহার করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। গণতন্ত্রের অবক্ষয়, সংখ্যালঘু অধিকার বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা—এসব বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে এগুলো আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
পাকিস্তানের চিত্র আরও জটিল। দেশটি কখনো এ ধরনের কৌশলের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, আবার কখনো নিজেই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০২২ সালে ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতি নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। তথাকথিত সাইফার বার্তা, মার্কিন অসন্তোষ এবং দ্রুতগতির অনাস্থা ভোট—সবকিছুই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদিও চূড়ান্ত সত্য নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রযুক্তি সেখানে সক্রিয় ছিল—এ বিষয়ে অনেক পর্যবেক্ষক একমত।
এখানে একটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে, যা কূটনৈতিক ভদ্রতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা উচিত নয়। সব বিক্ষোভ একই ধরনের নয়। কিছু আন্দোলন প্রকৃত সামাজিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, কিছু আবার বৃহত্তর রাজনৈতিক অপারেশনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
একটি প্রকৃত গণআন্দোলনের জবাব হতে পারে সংস্কার, সংলাপ ও সমঝোতা। কিন্তু যদি কোনো আন্দোলনের ভেতরে বিদেশি অর্থায়ন, সমন্বিত অপপ্রচার এবং গোপন রাজনৈতিক কৌশলের উপাদান সক্রিয় থাকে, তবে রাষ্ট্রকে গোয়েন্দা সক্ষমতা, আইন প্রয়োগ এবং অর্থায়ন নেটওয়ার্কের উপর নজরদারির মতো ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সামনে তাই নতুন চ্যালেঞ্জ—স্বতঃস্ফূর্ত গণঅসন্তোষ এবং পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের সক্ষমতা অর্জন। ইয়াবা-প্রভাবিত জনতা, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সমন্বয়কারী, ছায়ার আড়ালে অবস্থান নেওয়া স্নাইপার কিংবা পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক প্রচার—এসব যদি সত্যিই কোথাও উপস্থিত থাকে, তবে সেগুলো নিছক জনবিক্ষোভের লক্ষণ নয়; বরং সুপরিকল্পিত প্রযোজনার উপাদান। আর প্রতিটি প্রযোজনারই একজন প্রযোজক থাকে। ‘তেলাপোকা তত্ত্ব’-এর মূল বার্তাও সেখানেই। তেলাপোকা অন্ধকারে বেঁচে থাকে। আলো জ্বাললেই তারা দৃশ্যমান হয়।
ঢাকার তরুণদের অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, তারা ইতিহাস রচনা করছেন। হয়তো সত্যিই কেউ কেউ করেছিলেন। কিন্তু অন্য অনেকেই অজান্তে অন্য কারও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: আমরা কি ইতিহাসের পাঠ সময়মতো শিখব, নাকি প্রতিবারই তার মূল্য দিতে হবে অস্থিতিশীলতা, বিভাজন ও অনিশ্চয়তার মাধ্যমে?
লেখক : প্রাবন্ধিক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা : ১৪ জুন, ২৬