এম এ হোসাইন,
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরটি এমন দ্রুততার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল যে অনেকেই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। প্রায় চার দশক ধরে তিনি ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি পুরো প্রজন্ম বড় হয়েছে, একটি রাষ্ট্র তার নীতি ও কাঠামো গড়ে তুলেছে, এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি স্থায়ী প্রভাব তৈরি হয়েছে।
কিন্তু তার মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই আরেকটি ঘটনা ঘটে—যা অনেক পর্যবেক্ষককে বিস্মিত করে। ইরানের এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলি দ্রুততার সঙ্গে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। কাগজে-কলমে এটি ছিল একটি নিয়মতান্ত্রিক উত্তরাধিকার। কিন্তু এই দ্রুততা একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
আসলে কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কে সেই চেয়ারে বসছেন?
রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র সাধারণত সংকটের সময়ই প্রকাশ পায়। তখন আনুষ্ঠানিক পদবী বা সংবিধানের ধারাগুলো অনেক সময় অলংকারের মতো মনে হয়। বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে সেই সব প্রতিষ্ঠান, যেগুলো নীরবে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখে এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় নেতৃত্ব নয়। সেটি হলো ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—আইআরজিসি। অনেক বছর ধরে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি অদ্ভুত দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। একদিকে রয়েছে ধর্মীয় নেতৃত্ব—যারা শিয়া ধর্মতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে বিপ্লবী আদর্শকে ধরে রাখে। অন্যদিকে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড—যা একটি বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। এই দুই শক্তি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলেও তারা এক নয়। ধর্মীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রকে বৈধতা দেয়। আর সামরিক শক্তি দেয় বিপ্লবী গার্ড।
মোজতবা খামেনির উত্থান এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে নির্বাচন করেছে এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলি। কিন্তু অপ্রকাশ্য বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব স্পষ্ট।
এই নির্বাচন কেবল ধর্মীয় বিবেচনার ফল নয়; বরং একটি কৌশলগত হিসাব। মোজতবা শুধু সাবেক নেতার ছেলে নন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি সক্রিয় ছিলেন। তার রাজনৈতিক মনোভাবও ধর্মীয় বিতর্কের চেয়ে শৃঙ্খলা ও শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকে।
ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আদর্শিক কর্তৃত্বের উৎস, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা প্রায়ই নিরাপত্তা যন্ত্রের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। আধুনিক মিশরেও রাষ্ট্রপতিরা বদলেছেন, কিন্তু সেনাবাহিনী রাজনৈতিক জীবনের শেষ সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে থেকেই গেছে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামো কাজ করে। ধর্মীয় নেতৃত্ব মতাদর্শ সরবরাহ করে, আর বিপ্লবী গার্ড সেটিকে বাস্তবে কার্যকর করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মোজতবার উত্থানকে রাজবংশীয় উত্তরাধিকার হিসেবে না দেখে বরং একটি নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা সংহতকরণ হিসেবে দেখা যায়। তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—একজন ব্যক্তি কি সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের ইরান এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে কোনো একক নেতা সহজে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। দেশটি বর্তমানে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইতিমধ্যেই বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সামরিক কমান্ডার, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, এমনকি মন্ত্রিসভার সদস্যরাও এই সংঘর্ষের শিকার হয়েছেন।
প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা নিহত হওয়ার খবর আসে। যেকোনো রাষ্ট্রেরই জরুরি পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু এত বড় মাত্রার নেতৃত্ব সংকট মোকাবিলার জন্য খুব কম ব্যবস্থাই তৈরি থাকে। এই পরিস্থিতিতেই ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে মূলত একটি মিশ্র ব্যবস্থা হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। এখানে নির্বাচন রয়েছে, তবে তা ধর্মীয় তত্ত্বাবধানের সীমার মধ্যে। সর্বোচ্চ নেতার হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকলেও সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত বিভিন্ন গোষ্ঠীর পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, সামরিক কমান্ডার এবং ধর্মীয় আলেম—সবারই কিছু না কিছু প্রভাব রয়েছে।
এই কাঠামো কখনও কখনও জটিল এবং অকার্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে এটি কোনো না কোনোভাবে কাজ করে এসেছে। যুদ্ধ সেই ভারসাম্য বদলে দেয়। যখন ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে শুরু করে এবং নেতৃত্বের পরিধি সংকুচিত হতে থাকে, তখন পরামর্শ বা আলোচনা বিলাসিতায় পরিণত হয়। তখন ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রতিষ্ঠানের দিকে সরে যায়, যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ইরানের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠান হলো বিপ্লবী গার্ড। তাদের হাতে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী। তারা দেশের অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে—লেবানন থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত—তাদের মিত্র মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক রয়েছে। যদি ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে বিপ্লবী গার্ডের প্রভাব আরও বাড়বে—এটি প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
এই বাস্তবতা আরেকটি বিষয় ব্যাখ্যা করে। মোজতবা খামেনি হয়তো তার বাবার মতো শক্তিশালী নেতা হয়ে উঠতে পারবেন না। আলী খামেনি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরি করেছিলেন। তিনি দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একে অপরের বিপরীতে ব্যবহার করতেন, যাতে কোনো একটি গোষ্ঠী অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। মোজতবার হাতে সেই দীর্ঘদিনের সঞ্চিত কর্তৃত্ব নেই। বরং তার বৈধতার বড় অংশ নির্ভর করছে সেই প্রতিষ্ঠানের উপর—যাদের তাত্ত্বিকভাবে তার তত্ত্বাবধানে থাকার কথা।
এটি নিজেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সমীকরণ। কারণ বিপ্লবী গার্ডও একক নয়। তাদের ভেতরেও প্রজন্মগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। কিছু কমান্ডার আঞ্চলিক বিস্তারকে অগ্রাধিকার দেন, অন্যরা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেন।
গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি হামলায় বিপ্লবী গার্ডের বহু সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এর ফলে সংগঠনের নেতৃত্বে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। নতুন কমান্ডাররা নতুন অগ্রাধিকার নিয়ে আসেন। ফলে প্রতিযোগিতা কমার বদলে অনেক সময় বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতা হয়তো ধীরে ধীরে একটি প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারেন—যিনি বাস্তব সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করবেন।
ইরানের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আগেও এসেছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা ঘটেনি। বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নতুনভাবে মানিয়ে নিয়েছিল। তখনকার তুলনামূলক দুর্বল উত্তরসূরি আলী খামেনি ধীরে ধীরে ক্ষমতা সংহত করেছিলেন।
কিন্তু আজকের ইরানের পরিস্থিতি ভিন্ন। রাষ্ট্রটি একই সঙ্গে বহু সংকটের মুখে রয়েছে—কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গভীর অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শত্রুভাবাপন্ন আঞ্চলিক পরিবেশ এবং এমন একটি তরুণ জনগোষ্ঠী যারা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার প্রতি ক্রমশ সন্দিহান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিক্ষোভ দেখিয়েছে যে সরকারের সামাজিক বৈধতা কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানের দাবিতে রূপ নিয়েছিল। সরকার শক্তি প্রয়োগ করে সেই আন্দোলন দমন করেছিল। স্বল্পমেয়াদে তা কার্যকর ছিল। কিন্তু ইতিহাস বলছে, দমন-পীড়ন কখনও গভীর সমস্যার সমাধান নয়। এটি কেবল সময়কে পিছিয়ে দেয়।
খামেনির মৃত্যু তাই একটি অদ্ভুত মুহূর্ত তৈরি করেছে। কিছু ইরানি নাকি এটি উদযাপন করেছে। অন্যরা নীরব থেকেছে—কারণ তারা নিশ্চিত নয় সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। দেশের বাইরে বিরোধী নেতারা, যেমন রেজা পাহলভি ইরানিদের আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশি সরকারগুলোও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। তবে বিপ্লব কখনও নির্দেশে ঘটে না।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের এখনও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে—গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, অনুগত নিরাপত্তা বাহিনী এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের একটি বিশাল কাঠামো যা এই ব্যবস্থার টিকে থাকার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে যখন দেশ একটি বহিরাগত সংঘাতে জড়িয়ে আছে, তখন এই কাঠামো ভেঙে পড়া সহজ নয়।
ফলে আবারও মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যায়। মোজতবা খামেনি কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ? স্বল্পমেয়াদে হয়তো ততটা নয় যতটা শিরোনামগুলো বোঝায়। ইরানের যুদ্ধযন্ত্র চালানোর জন্য একজন সর্বোচ্চ নেতা অপরিহার্য নয়। ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বা যুদ্ধ পরিচালনা এমন প্রতিষ্ঠানগুলোই করবে যারা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের গুরুত্ব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সর্বোচ্চ নেতা ইরানের এই জটিল ব্যবস্থার প্রতীকী বন্ধন হিসেবে কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করেন, আদর্শিক সীমারেখা নির্ধারণ করেন এবং অনিশ্চয়তার সময় রাষ্ট্রকে একত্রে ধরে রাখেন। এই ভূমিকা না থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় দেশকে ভিন্ন ভিন্ন দিকে টেনে নিতে পারে। তাই মোজতবার উত্থান মূলত ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বা শক্তির বিষয় নয়। এটি ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা।
কঠিন সময়ে রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই প্রক্রিয়ার চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়। উত্তরাধিকার তখন অনেকটা জরুরি চিকিৎসার মতো হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো সম্ভবত ঠিক সেই হিসাবটাই করেছে। তবে তারা যে ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে, সেটি বর্তমান চাপ সহ্য করতে পারবে কি না—তা এখনও অনিশ্চিত।
ইতিহাস দেখায়, শাসনব্যবস্থা সাধারণত একটি মাত্র ঘটনার কারণে ভেঙে পড়ে না। বরং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধের চাপ ধীরে ধীরে একটি ব্যবস্থাকে ক্ষয় করে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই শক্তিগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতার আগমন হয়তো সাময়িকভাবে সেই বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে সেই চ্যালেঞ্জ গুলোর মুখোমুখি হতেই হবে।
লেখক : ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. সময়ের আলো, ঢাকা : ১২ মার্চ, ২৬
No comments:
Post a Comment