Thursday, 30 October 2025

মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা নাকি চীনের আধিপত্য?

এম এ হোসাইন,

মিয়ানমারের উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলের সংঘাত পরিস্থিতিতে এক নীরব পরিবর্তন ঘটে চলেছে। কিছু সময়ের পরাজয় ও হতাশার পর, জান্তা সরকার আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে। আর এই পুনরুত্থানের পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে চীনকেই।

কিয়াওকমে, একটি ছোট শহরের কথাই উল্লেখ করা যাক। মাসের পর মাস যুদ্ধের পর প্রায় এক বছর আগে শহরটি দখল করেছিল তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)। চীনের ইউনান প্রদেশকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথগুলোর একটির এই শহরটির উপর তৈরি করা হয়েছে। শহরটি যখন বিদ্রোহীদের হাতে যায়, অনেক বিশ্লেষকই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে মিয়ানমারের জান্তা শাসন শিগগিরই ভেঙে পড়বে। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টে, মাত্র তিন সপ্তাহের এক তীব্র অভিযানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী শহরটি পুনর্দখল করে নেয়।

এই একটি ঘটনাই অনেক কিছু বলে দেয়। এটি কেবল সামরিক জয়ের গল্প নয়, এটি ছিল বেইজিংয়ের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং চীনের আশীর্বাদে জান্তার আত্মবিশ্বাসের পুনর্জাগরণ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিয়াওকম ফিরে পেয়েছে শুধু সাহসের জোরে নয় বরং বেইজিংয়ের আশীর্বাদে। প্রতিদিনের বিমান হামলায় ধ্বংস হয়েছে বিদ্রোহীদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। জেট বিমানগুলো টনকে টন বোমা বর্ষণ করেছে, আর চীনের তৈরি ড্রোনগুলো আঘাত হেনেছে বিদ্রোহী ঘাঁটিগুলোতে। শক্তিশালী প্রতিবেশীর সরবরাহে নতুন অস্ত্র হাতে পেয়ে জান্তা যেন নবজীবন ফিরে পেয়েছে।

অবশ্য চীনের এই জড়িত হওয়া কেবল কোন সাহায্য নয়, কৌশলগত সুবিধাও রয়েছে। বেইজিং মিয়ানমারকে কখনও সমান অংশীদার হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে দেখে একটি করিডোর হিসেবে, একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। যা তাকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথ দেয় এবং  তার জ্বালানি ও বাণিজ্য রুটের জন্য অপরিহার্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একটি স্থিতিশীল জান্তা মানেই চীনের জন্য স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার। তাই যে কোন মাধ্যমেও স্থিতি বজায় থাকুক, এটাই বেইজিংয়ের কাছে একান্ত কাম্য।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আন্তর্জাতিক সমালোচনা সত্ত্বেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে কূটনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। মিয়ানমার জান্তা ঘোষণা করেছে, এ বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন দিবে এবং যেখানে অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-কে অংশ গ্রহণ করতে দেওয়া হবে না।  আশ্চর্যজনকভাবে, চীন এই সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি জানায়নি, বরং তা সমর্থন করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বর্তমান ক্ষমতাশীনদের পক্ষ থেকে এই ধরনের স্বীদ্ধান্তের প্রতীকী অর্থ বেশ ভয়াবহ। ২০২০ সালের নির্বাচনের বিজয়ীদের বাদ দিয়ে যদি কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে এটা কোনো গণতন্ত্র নয় বরং এটি এক রাজনৈতিক হাস্যরসে পরিনত হবে। যদিও চীনের কাছে গণতন্ত্র নয়, আনুগত্যই মুখ্য।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ সালের জান্তা এখন আর ২০২১ সালের বিভ্রান্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত সেনাবাহিনী নয়। তারা অভিযোজিত হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে ও কার্যকরভাবে। জাতিগত মিলিশিয়া ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ)-এর বিরুদ্ধে ব্যর্থতা থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে। প্রযুক্তি ও জনশক্তিতে তারা বিনিয়োগ করেছে। ড্রোন যুদ্ধই তার বড় উদাহরণ। একসময় বিদ্রোহীরা স্বল্পমূল্যের বাণিজ্যিক ড্রোন দিয়ে সেনা কনভয় ধ্বংস করত। এখন আর তা সম্ভব নয়। চীনের উন্নত জ্যামিং প্রযুক্তি মাঝ আকাশেই সেই ড্রোনগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেয়। একইসঙ্গে মিয়ানমার জান্তা হাজার হাজার নতুন ড্রোন আমদানি করেছে। এগুলো কেবল তথ্য সংগ্রহের জন্য নয়, হত্যার জন্যও। আকাশের আধিপত্য যা একসময় বিদ্রোহীদের রক্ষা করত, এখন তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

২০২৩ সালে চালু করা বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬০,০০০ নতুন সৈন্য যুক্ত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা এখন নিশ্চিত যে সেনাবাহিনীর পুনরুত্থান বাস্তব এবং বিদ্রোহী মিলিশিয়া গুলোও তা স্বীকার করছে। ড্রোন হামলা এখন নিয়মিত ভাবে চলছে যা শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিচ্ছে। 

প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি এখন হতাশাজনক। চীন তার সীমান্ত এবং অস্ত্র ও যন্ত্রাংশের প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে, যা ছিল তাদের যুদ্ধের জ্বালানি। একসময় ইউনান হয়ে যে ড্রোন উপকরণ সহজে পাচার হতো, এখন সেগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।  বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভিতরেও বিভাজন বেড়েছে। নেতৃত্বহীন, ছিন্নভিন্ন বিরোধীরা ঐক্য হারাচ্ছে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) যা অপসারিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা  গঠিত ছায়া সরকার—বাস্তবে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণে নেই। সাহসী হলেও পিডিএফ বাহিনী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, কোন আন্তঃসমন্বয় নেই।

টিএনএলএ, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ), এবং আরাকান আর্মি একত্রিত হয়ে গঠন করেছিল ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স। ২০২৩ সালের শেষের দিকে তারা “অপারেশন ১০২৭”-এর অধীনে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করে। ঐ অভিযানে তারা প্রায় ১৮০টি সামরিক ঘাঁটি দখল করে নেয় এবং উত্তর শান রাজ্যের বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলো। এমনকি মান্দালয় পর্যন্ত তাদের নাগালে চলে এসেছিল। তাদের এই অগ্রগতির ফলে মনে হচ্ছিল, জান্তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তারপর হলো চীনের হস্তক্ষেপ।

চীনের এই অবস্থান বদল রাতারাতি হয়নি। প্রথমে তারা বিদ্রোহীদের সহ্য করেছিল, এমনকি সীমান্তের স্ক্যাম সেন্টারগুলো ভেঙে দিতে দিয়েছিল, যা চীন সরকারকে বিব্রত করেছিল। কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণ হওয়া মাত্রই সেই সহনশীলতা শেষ হয়। ২০২৪ সালের মধ্যমার্ধে চীন স্পষ্টভাবে জান্তার পক্ষে ঝুঁকে পড়ে। নীরব চাপে এমএনডিএএ আত্মসমর্পণ করে লাশিও শহরের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি, যা চীনা বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল, অন্য বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। সীমান্ত বন্ধ হয়ে আসতেই বিদ্রোহীদের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। মিয়ানমার জান্তা থাই সীমান্তেও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে, ফলে বন্ধ হয়ে যায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ। একসময় আত্মবিশ্বাসে ভরপুর প্রতিরোধ বাহিনী এখন ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও মানসিক ভাবে বেশ কোণঠাসা।

এই সবকিছুই কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র। কারণ, মিয়ানমার সবসময়ই প্রতিবেশীদের কৌশলগত দাবার ছক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৫০-এর দশকে পশ্চিমা প্রভাব ঠেকাতে চীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছিল। শীতল যুদ্ধের সময় এই পাহাড়গুলো ছিল বিদেশি ভাড়াটে সৈন্য ও মাদক সিন্ডিকেটের আস্তানা। সবই ঘটেছিলো কারও না কারও নীরব মদতে।

আজকের গল্প সেই পুরোনো গল্পের ডিজিটাল সংস্করণ। মাওয়ের আদর্শের জায়গা নিয়েছে চীনা অস্ত্র, কিন্তু নীতিটা একই: মিয়ানমারকে নিয়ন্ত্রণ করো, তাহলেই প্রবেশাধিকার পাবে বঙ্গোপসাগরে। জান্তা এটা বোঝে। তাই টিকে থাকার তাগিদে তারা চীনের খেলায় অংশ নিচ্ছে—ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। আর বেইজিং পাচ্ছে মিয়ানমার, ভারত, আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পশ্চিমাদের দুর্বল অবস্থানের উপর তার কৌশলগত প্রভাব।

প্রশ্ন হচ্ছে, এখন কী হবে? চীনের তত্ত্বাবধানে জান্তা-নেতৃত্বাধীন “নির্বাচন” অনুষ্ঠিত হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এটিকে স্থিতিশীলতার পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। পশ্চিমা সরকারগুলো নিন্দা জানাবে, আসিয়ান সতর্ক ভাষায় বিবৃতি দেবে, আর বেইজিং হাসবে।

কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—চীনের এই অবস্থান মিয়ানমারকে স্থিতিশীল করবে, নাকি দমিয়ে ফেলবে? ইতিহাস বলে, বিদেশি শক্তির ভরসায় টিকে থাকা সামরিক শাসন কখনো বৈধতা পায় না। তারা টিকে থাকে ভয় দেখিয়ে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নয়। এই একই মিয়ানমার সেনাবাহিনী একসময় রাশিয়ার কাছ থেকে জেট ফাইটার কিনেছিল, ভারতের সঙ্গে তথ্য সহযোগিতা করেছিল। তাদের আনুগত্য সুবিধাভিত্তিক। আর চীনের একছত্র সহায়তাও মুছে দিতে পারে না সেই বাস্তবতা যে জান্তার শাসন প্রতিষ্ঠিত শাসন নয়, বরং একধরনের দমন পদ্ধতি।

শেষ পর্যন্ত, মিয়ানমারের ট্র্যাজেডি আসলে কিয়াওকমে বা লাশিও শহরটি কার দখলে তার চেয়ে বড় কিছু। এটা জাতির আত্মা হারানোর গল্প। চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় জান্তা হয়তো যুদ্ধ জিতছে, কিন্তু জনসমর্থন হারাচ্ছে। গ্রাম জ্বলছে, মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে, শিশুরা ড্রোন-ছায়ার আকাশের নিচে বড় হচ্ছে। এটা স্থিতিশীলতা নয়, এটা আত্মসমর্পণকে শান্তি বলে চালানো। বেইজিং একে বলবে “শান্তি”, নেপিদো বলবে “নিরাপত্তা।” কিন্তু সাধারণ বার্মিজদের জন্য এটি কেবল ভয়ের প্রত্যাবর্তন। আর ইতিহাস যেমন বলে, ভয় কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি শুধু অপেক্ষা করে—নীরবে, ধৈর্য ধরে—পরবর্তী বিদ্রোহের জন্য।

লেখক : প্রাবন্ধিক। 

এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :

১. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা : ৩১ অক্টোবর, ২৫

২. সময়ের আলো, ঢাকা : ০১ নভেম্বর, ২৫

   

   

No comments:

Post a Comment