এম এ হোসাইন,
আধুনিক যুগের প্রায় পুরো সময়জুড়ে আর্কটিক অঞ্চল ছিল মহাশক্তিদের কৌশলগত কল্পনায় একপ্রকার অনুপস্থিত ভূখণ্ড। অতিরিক্ত ঠান্ডা, দূরবর্তীতা এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অঞ্চলটিতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন দেখা যায়নি। নীতিনির্ধারকেরা একে দেখতেন বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভয়ারণ্য, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ ও আদিবাসী অধিকার রক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে। যেখানে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কিছুটা ভদ্রতার সীমানায় আটকে থাকত। সেই যুগ শেষ হয়েছে। আজ আর্কটিক ধীরে ধীরে সেই ভূমিকাই নিচ্ছে যা রোমের জন্য ছিল ভূমধ্যসাগর বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য ভারত মহাসাগর—এক এমন সীমান্ত, যেখানে কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও সামরিক শক্তি একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়।
তিনটি পরাশক্তি এই ভূ-অঞ্চলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে: রাশিয়ার সামরিক পুনরুত্থান, চীনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়ার তাড়াহুড়ো। এগুলোর কোনোটাই আগের যুগের “গলতে থাকা হিমবাহ” বা “বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী”র গল্পের পুনরাবৃত্তি নয়। এখন যুক্তি অনেক কঠোর, অনেক ঠান্ডা, এবং অনেক বেশি পরিচিত—কে নিয়ন্ত্রণ করবে সম্পদ, সমুদ্রপথ, আর সামুদ্রিক-নিয়ম?
ইতিহাস সচরাচর যেমন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে থাকে, তেমনি আর্কটিকে তার প্রতিধ্বনি বেশ জোরেই শোনা যাচ্ছে। শীতলযুদ্ধের সময়ে মার্কিন ও সোভিয়েত সাবমেরিনগুলো বরফের নিচে একে অপরকে ছায়ার মতো অনুসরণ করত পারমাণবিক ক্ষমতার সূক্ষ্ম খেলার অংশ হিসেবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর উত্তেজনা কমে যায়, আর পরিবেশগত সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সেই সহযোগিতার চেতনাটি দুই দশক টিকে ছিল; আজ তা দ্রুতই উবে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের শুরু ২০১৪ সালের দিকে, যখন রাশিয়া আর্কটিককে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করে। মস্কো পঞ্চাশের বেশি সামরিক স্থাপনা আধুনিকায়ন বা পুনরায় চালু করেছে, রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটিয়েছে, এবং তাদের নর্দার্ন ফ্লিটকে নতুনভাবে শক্তিশালী করেছে—যা তাদের দ্বিতীয়-আঘাতের (second-strike) পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি। এগুলো শুধু প্রতীকী বার্তা নয়; এগুলো প্রতিফলিত করে ভ্লাদিমির পুতিনের বহুবার ঘোষিত সেই বিশ্বাস, যা জাতির বেঁচে থাকা নির্ভর করছে নর্দার্ন সি রুট এবং আর্কটিক সমুদ্রতলের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপর।
জলবায়ু পরিবর্তন এই বিশ্বাস আরও ত্বরান্বিত করেছে। বরফ গলার ফলে এমন নৌপথ খুলে গেছে যা এশিয়া–ইউরোপ বাণিজ্যযাত্রাকে প্রায় অর্ধেক সময় কমিয়ে দিতে পারে। অঞ্চলটিতে রয়েছে বিপুল হাইড্রোকার্বন মজুদ, বিরল খনিজ, এবং সম্ভাব্য মাছের ভাণ্ডার। ভূ-রাজনীতিতে সুযোগ মানেই প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতা মানেই সামরিকীকরণ।
এবার দৃশ্যে প্রবেশ করে চীন, যার কোনো আর্কটিক সমুদ্রতট নেই, কিন্তু আছে আর্কটিককে কেন্দ্র করে বিস্তৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষা। বেইজিং নিজেকে বলে “নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র”—একটি সংজ্ঞা যার আন্তর্জাতিক আইনে কোনো স্বীকৃতি নেই, কিন্তু এর কৌশলগত ভাবনার ইঙ্গিত স্পষ্ট। তাদের লক্ষ্যও অদৃশ্য নয়: নৌপথ, সমুদ্রতলের খনিজ, বিরল ধাতু, এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অংশীদারিত্ব—যার বেশিরভাগই রাশিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে চলছে।
চীনের কৌশল ধীর, হিসাবি এবং পরিচিত। বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন। অবকাঠামো বিনিয়োগ। যৌথ উদ্যোগে অংশগ্রহণ। বিজ্ঞানচর্চার আড়ালে বরফভেদী জাহাজ পাঠানো—যেখানে সংগৃহীত তথ্য সামরিকভাবেও ব্যবহারযোগ্য। অ্যান্টার্কটিকায় এ ধরনের কার্যক্রম নীরব উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে; আর্কটিকে সেই উদ্বেগ আরও তীব্র।
পশ্চিমা দেশগুলোর চিন্তার মূল বিষয় শুধু চীনের উপস্থিতি নয়, চীন-রাশিয়া অংশীদারিত্বেও। পশ্চিমা সরকারগুলো এখন এই জোটকে একটি একক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। রাশিয়ার আছে ভৌগোলিক সুবিধা ও সামরিক অবকাঠামো; চীনের আছে পুঁজি ও বৈশ্বিক বিস্তার। একত্রে তারা পাল্টে দিচ্ছে একসময় পশ্চিম-নিয়ন্ত্রিত এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘসময় আর্কটিককে পরিবেশগত নীতি–গবেষণার পার্শ্ব প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু তাদের সেই আত্মতুষ্টি এখন শেষের দিকে। কানাডা সবচেয়ে দ্রুত নীতি-পরিবর্তন করেছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় আছে, এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ফিনল্যান্ডের সঙ্গে আইস প্যাক্টে যোগ দিয়েছে ভবিষ্যতের বরফভেদী জাহাজ তৈরির জন্য। তারা প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ ঘোষণা করেছে আর্কটিক প্রকল্পের জন্য এবং ২০২৪ সালে আরও দৃঢ় ও কার্যকরী পররাষ্ট্রনীতি প্রকাশ করেছে।
ওয়াশিংটনে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আরও তীব্র ভাবে পরীলক্ষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভয় যে রাশিয়া ও চীন একত্রে আর্কটিক শাসননীতি নির্ধারণ করবে, যেখানে ওয়াশিংটনের ভূমিকা থাকবে সামান্য। এর প্রতিক্রিয়ায় ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে - আলাস্কার নোমে গভীর পানির বন্দর নির্মাণ, আর্কটিক-সক্ষম জাহাজ তৈরির দ্রুত অনুমোদন, এবং সামুদ্রিক নজরদারিতে ব্যাপক বিনিয়োগ। এমনকি আমলাতান্ত্রিক সামান্য পরিবর্তনও বিষয়টির গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়—আর্কটিক জাহাজ নির্মাণের দায়িত্ব জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সরিয়ে বাজেট দপ্তরে নেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি এখন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ।
নর্ডিক দেশগুলোতে রূপান্তর আরও চমকপ্রদ। ন্যাটোর নবীন সদস্য ফিনল্যান্ড এখন পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় আর্কটিক শক্তি। সুইডেন ও নরওয়ে তাদের নিজস্ব কৌশল প্রসারিত করছে। গ্রিনল্যান্ডের মাধ্যমে ডেনমার্ক সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে যেন কোনো ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি না হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সিগন্যাল দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ডকে তারা চীনের প্রভাব বলয়ে যেতে দেবে না। অর্থাৎ, আর্কটিক এখন ন্যাটোর উত্তরে সম্প্রসারণের কার্যকরী ভাবে এগুচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে আর্কটিক কাউন্সিল ছিল দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতার উদাহরণ—পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, আদিবাসী অধিকার, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা। উত্তেজনা ছিল কম। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে। বৈঠকগুলো এখন বেশি বিতর্কপূর্ণ, সহযোগিতা সীমিত, সন্দেহ গভীর।জলবায়ু উদ্বেগ এখনও আলোচনার অংশ, কিন্তু সেগুলো ঢেকে যায় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধার প্রশ্নে। অধিকাংশ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঠিক এমনভাবেই শুরু হয়—নীরবে, ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
দুটি ক্ষেত্র বিশেষ নজর দাবি করে। প্রথমটি হচ্ছে নর্দার্ন সি রুট। রাশিয়া এই পথকে আন্তর্জাতিক জলপথ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ মনে করে। মস্কো চায় যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং ফি–সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এর বিপরীতে উন্মুক্ত নৌচলাচলের পক্ষে। ইতিহাসে এমন মতভেদ বহু সংঘাতের জন্ম দিয়েছে—হরমুজ প্রণালী থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ভূখণ্ড দাবি ও শাসনগত শূন্যতা। আর্কটিক সমুদ্রতল জাতিসংঘ সমুদ্র আইন (UNCLOS)-এর আওতায় বিভিন্ন দেশের ওভারল্যাপিং দাবির মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বিবাদপূর্ণ অঞ্চল রাশিয়া, ডেনমার্ক (গ্রিনল্যান্ডের মাধ্যমে) ও কানাডার মধ্যে। এদিকে বাড়তে থাকা নৌ-মহড়া গুলো ভুল ব্যাখ্যা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায় যা ইতিহাসে বহু সংকটের পূর্বভাগ।
আর্কটিক পরিস্থিতিকে শীতলযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি বলা কোনো অংশেই কম নয়। তুলনাটি যদিও পুরোপুরি সঠিক নয়, তবে উপযোগী। তখন লড়াই ছিল মতাদর্শের; এখন তা সম্পদের। তখন সংঘাত ছিল বৈশ্বিক; এখন তা কেন্দ্রীভূত পরিবর্তনশীল এক অঞ্চলে। তবে একটি সত্য অপরিবর্তিত—কৌশলগত শূন্যতা প্রতিযোগিতাকে আমন্ত্রণ জানায়।
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বলতে হয়তোবা সরাসরি যুদ্ধ হবার সম্ভাবনা নেই, বরং একটি কঠোর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। রাশিয়া সামরিকীকরণ বাড়াবে, চীন তার বিস্তার অব্যাহত রাখবে, ন্যাটো প্রতিক্রিয়া জানাবে। সহযোগিতা পুরোপুরি বিলীন হবে না, কিন্তু তা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সীমাবদ্ধ থাকবে।
মূল প্রশ্ন—বিশ্ব কি এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে যাতে অপ্রয়োজনীয় কোনো সংকট না তৈরি হয়? ইতিহাস আশাবাদ ও সতর্কতা দুই ইঙ্গিতই দেয়। অ্যান্টার্কটিকা দশকের পর দশক নিরস্ত্রীকৃত রয়েছে। বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগর দেখায় ক্ষমতার দাবি, সামরিকীকরণ ও জাতীয় গৌরব মিশলে কী ঘটতে পারে। আর্কটিক কোন পথে যাবে? আজকের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে স্বচ্ছতা, শাসননীতি ও সামরিক সংযম এর মধ্যে সেটাই যা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. সময়ের আলো, ঢাকা : ০৬ ডিসেম্বর, ২৫
২. দেশ রূপান্তর, ঢাকা : ২৭ ডিসেম্বর, ২৫
No comments:
Post a Comment