এম এ হোসাইন,
রাজনীতি যদি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে, তবে একসময় তাকে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হয়। নির্বাচনী স্লোগান খুব দ্রুতই শাসনের কঠিন বাস্তবতায় উবে যায়। গণরায়ের ম্যান্ডেট কোনো ট্রফি নয়; এটি এক গভীর দায়বদ্ধতা। আর রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পর ক্ষমতার দুয়ারে দাঁড়ানো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য সেই দায় সহজ নয়, বরং ভারী ও জটিল।
তারেক রহমান এমন এক সময়ে ক্ষমতার দারপ্রান্তে অবস্থান করছেন, যখন জনমানসের প্রত্যাশা শুধু উচ্চ নয়—অস্থির ও অধীর। দেশ একধরণের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থা এবং সামাজিক বিভাজনের দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। আগামী সরকারকে বিচার করা হবে কথার জোরে নয়, স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ভিত্তিতে।
ক্ষমতার প্রথম দিন থেকেই যে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ বিএনপি সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে, সেগুলো অনিবার্য ও জরুরি।
বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বাজারই নিয়ন্ত্রণ করবে সরকারকে। বাংলাদেশে টানা কয়েকটি সরকার নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অনীহা কিংবা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। পেঁয়াজ, চাল, ভোজ্যতেল, চিনি—এসব প্রয়োজনীয় পণ্য যেন জল্পনা-কল্পনার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। রমজানের আগে মূল্যবৃদ্ধি এখন আর মৌসুমি উঠানামা নয়; এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শোষণে রূপ নিয়েছে।
এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিকও। যখন নিত্যপণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন প্রকৃত মূল্য দেয় দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টসকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আঘাত নীরবে সহ্য করে এই শ্রেণিই। এদিকে অভিযোগ রয়েছে—সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির দূর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিরাই কখনো চোখ বুজে থেকেছে, কখনো বা বাজার কারসাজির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
এই চক্র ভাঙতে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে অভিযানের নাটক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহব্যবস্থার ডিজিটাল নজরদারি, প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর প্রয়োগ এবং বাজার তদারকি সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বচ্ছ আমদানি নীতি, বাফার স্টক ব্যবস্থাপনা ও তাৎক্ষণিক তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধ মূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এখানে ব্যর্থ হলে বিএনপি সরকার শুরুর আগেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির সূচক নয়; এটি রাজনৈতিক বিস্ফোরক।
আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও মব সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। যে রাষ্ট্রে জনতা আইন হাতে তুলে নেয়, সেখানে শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনি, হঠাৎ মিছিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দলীয় কোন্দল—এসব যেন স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো দ্বিধাগ্রস্ত, কখনো রাজনৈতিক প্রভাবাধীন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলাফল—পেশিশক্তি বিচারপ্রক্রিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের করণীয় স্পষ্ট, কিন্তু তা হতে হবে আইনানুগ ও পেশাদার। প্রথমত, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারবে না।
বাংলাদেশ অতীতেও নানাবিধ অস্থিতিশীল সময় দেখেছে; ভবিষ্যতেও দেখতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা যদি বাছবিচারহীন ও দৃশ্যমান না হয়, তাহলে নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়বে। তখন সরকার কেবল অর্থনৈতিক ব্যর্থতাই নয়, নিরাপত্তাহীনতার দায়ভারও তার উপর বর্তাবে।
আইসিইউতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।অর্থনৈতিক বাস্তবতা কঠিন। গত দেড় বছরে কার্যকর জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে। মূলধন পাচার বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে—ক্ষমতাশীন প্রভাবশালীদের একটি অংশ ও তাদের কুশীলবরা বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি তাৎক্ষণিক জোড়াতালি দিয়ে টেকে না। নতুন সরকারকে তিন দিক থেকে অগ্রসর হতে হবে: প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার, এবং বৈধ বিনিয়োগ আকর্ষণ। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সন্দেহজনক মূলধন স্থানান্তর অডিট করা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ অর্থ অনুসন্ধান জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব সংস্কার, ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য—এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, টিকে থাকার শর্ত।
একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প দাঁড়িয়ে ছিল পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় ও ক্ষুদ্রঋণ উদ্ভাবনের উপর। সেই স্থিতিস্থাপকতার বয়ানকে নতুন করে প্রাণ দিতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব কল্পনাই থেকে যাবে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনঃসমন্বয়—বিশেষত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন। ভৌগোলিক অবস্থান বদলানো যায় না। চারদিক ঘিরে থাকা প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক কৌশলগতভাবেই পরিচালনা করতে হয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত বন্ধন রয়েছে। আবার আঞ্চলিক বাস্তবতায় পূর্বদিকে মিয়ানমারের অস্থিরতা নতুন জটিলতা তৈরি করছে। নতুন সরকারকে মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে।
এই সম্পর্ক কোন আনুগত্যের আহ্বান নয়, আবার অকারণ সংঘাতেরও নয়। বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক কূটনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে ভারতেরও উচিত ‘বড় ভাই’ মানসিকতা পরিহার করা। ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের ছায়া অংশীদারত্বকে দুর্বল করে। আয়তনের বৈষম্য থাকলেও মর্যাদায় সমতা থাকতে হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী ও সার্বভৌম। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে বিচ্ছিন্নতা নয়; এটি একটি বিচক্ষণ হিসাব।
তরুণ প্রজন্মকে ব্যারিকেড থেকে শ্রেণিকক্ষে ফেরাতে হবে। সবচেয়ে সূক্ষ্ম চ্যালেঞ্জটি তরুণদের ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বৃহত্তর অংশ রাজনৈতিক অস্থিরতায় জড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে একাডেমিক ক্যালেন্ডার বিঘ্নিত হয়েছে, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙেছে। হঠাৎ ক্ষমতার স্বাদ, তারুণ্যের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার মিশ্রণ বর্তমান একটি প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করেছে।
যুবশক্তিকে কেবল ধ্বংসাত্মক নয় বরং তা সৃজনশীলে পরিনত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি তোলার অধিকার আছে, তবে তা সহিংসতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। সরকারের দায়িত্ব দ্বিমুখী: শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং ভবিষ্যতের আশা পুনর্গঠন করা। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিয়মিত চালু রাখা, বৃত্তি বাড়ানো, কর্মসংস্থানের বাস্তব পথ দেখানো এবং অতীতের ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাজনীতির পূনরাবৃত্তি রোধ করা অপরিহার্য।
নির্বাচনী সাফল্য সুযোগ এনে দেয়, নিশ্চয়তা নয়। মূল্যস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কূটনৈতিক ভারসাম্য, তরুণদের পুনর্নির্দেশ—এসব প্রান্তিক ইস্যু নয়; রাষ্ট্রের ভিত্তি। তারেক রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা দ্রুত উপলব্ধি করবেন—শাসন রাজনীতির চেয়ে কম নাটকীয়, কিন্তু বেশি কঠিন। এতে ধৈর্য লাগে, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন লাগে, কখনো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হয়। বাজার সিন্ডিকেট, অপরাধচক্র, দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থলিপ্সু গোষ্ঠী—এরা সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু নেতৃত্বের পরীক্ষা সেখানেই।
বাংলাদেশ অতীতে ঝড় সামলে পুনরায় শক্ত হয়ে দাড়িয়েছে। এ অধ্যায় পুনর্জাগরণের হবে, নাকি পশ্চাদপসরণের—তা নির্ভর করবে আশু সরকারের বাস্তবায়নের উপর। ক্ষমতা সাময়িক, দায়িত্ব তাৎক্ষণিক আর ইতিহাস বড়োই নির্মম।
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. দেশ রূপান্তর, ঢাকা : ১৮ ফেব্রুয়ারী,২৬
No comments:
Post a Comment