Wednesday, 6 May 2026

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: ক্ষমতা, মেরুকরণ ও আঞ্চলিক প্রভাব

এম এ হোসাইন,

ভারতের পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন কে "রাজনৈতিক অলৌকিক ঘটনা" বলার যথেষ্ট কারণ আছে। পনেরো বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অভূতপূর্ব উত্থান প্রথম দেখায় যেন এক আকস্মিক বিপর্যয়ের মতো। কিন্তু রাজনীতি সচরাচর আকস্মিক বিপর্যয়ে কাজ করে না। বরং তা ধীরে ধীরে জমা হয়, জেগে উঠে, আর তারপর প্রায় নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গ এর আগেও এমন গল্প দেখেছে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার চাপে কংগ্রেসের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বামফ্রন্ট (একসময় যাকে অজেয় বলে মনে করা হতো) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উদীয়মান জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। প্রতিটি পরিবর্তনকে তখন যুগান্তকারী মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি পরির্বতনই ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ক্ষয়প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৬ সালে বিজেপির জয় সম্পূর্ণভাবে সেই ধারার মধ্যেই পড়ে। এখানে কোনো জাদু নেই—শুধু সময়ের সঞ্চিত গতিবেগই অবশেষে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে কাছের ব্যাখ্যাটি হলো 'বিদ্বেষমূলক ভোট'। যেকোনো জায়গায় পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা অনেক দীর্ঘ সময়; বাংলায় তা যেন চিরন্তন। প্রশাসন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে কুখ্যাত 'কাটমানি' সংস্কৃতি—দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের আলোচনায় প্রাধান্য পেতে থাকে। একসময় যে কল্যাণ প্রকল্পগুলি দারুণ জনপ্রিয় ছিল, সেগুলো এখন আর রূপান্তরকর বলে মনে হয় না, বরং নিয়মিত কিছু বিষয়ে পরিণত হয়। ভোটাররা, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও তরুণ সমাজ, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুনরায় যাচাই করতে শুরু করে। একসময়ের কৃতজ্ঞতা বদলে গিয়ে প্রথমে 'পাওনা' মনে হয়, পরে সেটাই হয়ে ওঠে হতাশা।

কিন্তু শুধু বিদ্বেষমূলক ভোটই ২০০-এর বেশি আসনে জয় এনে দিতে পারে না। আরও গভীর কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক নিজেই নতুন করে সাজাতে সক্ষম হয়। অমিত শাহের কৌশলগত নির্দেশনায় এবং নরেন্দ্র মোদির বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে দলটি একটি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর খেলার কৌশল প্রয়োগ করে: একটি ভোটব্যাংককে সংহত করা এবং অন্যটিকে ভেঙে দেওয়া। হিন্দু ভোটের সংহতকরণ (প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৬৫%) এবং মুসলিম ভোটের আংশিক বিভাজনের ফলে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে কেন্দ্রগুলোতে একটি সিদ্ধান্তমূলক সুবিধা তৈরি হয়।

এটি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়, কিন্তু বাংলায় এটি একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দশকের পর দশক ধরে এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেকে গর্বিত করত প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ প্রতিরোধ করার জন্যে। সেই প্রতিরোধ এখন দুর্বল হয়েছে। বিজেপি শুধু একটি জাতীয় বয়ান আমদানি করেনি; বরং এটিকে স্থানীয় রূপ দিয়েছে। এটি পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করেছে, তৃণমূলের সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে বড় আকারের নগদ স্থানান্তর ও উন্নয়নের অঙ্গীকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে এটি আদর্শিক সংহতি এবং বাস্তব প্রণোদনার মধ্যে রেখা অস্পষ্ট করে দিয়েছে।

দলটির কৌশলগত শৃঙ্খলাও ছিল ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের প্রচারণার তুলনায় (যেটি কেন্দ্রীয় নেতাদের উপর অতিনির্ভরতা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরপুর ছিল) বিজেপি এবার কৌশল বদলায়। ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষের বদলে তারা প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে নজর দেয়। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনে, বুথ-স্তরের সংগঠনে ব্যাপক বিনিয়োগ করে এবং ১৭৭টি জয়-উপযোগী কেন্দ্রকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে। এমনকি তাদের সাংস্কৃতিক বার্তাটিকেও পরিমার্জিত করা হয়: দল সচেতনভাবেই 'বাঙালিয়ানা'কে গ্রহণ করে, 'বাইরের লোক' সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে যা আগে তাদের জনপ্রিয়তাকে সীমিত করে রেখেছিল।

ফলাফলটি নিছক রাজ্য-স্তরের জয় নয়; এটি ভারতের রাজনৈতিক ভূগোলে এক কাঠামোগত পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গ ছিল বিজেপির প্রসারের বিরোধিতা করা শেষ বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এর পতন আসাম, ত্রিপুরা ও ওড়িশায় অর্জিত সাফল্যের সঙ্গে মিলে পূর্ব ভারতে দলটির একীকরণ সম্পূর্ণ করে। এর প্রভাব কলকাতার বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে, এর প্রভাব তাৎক্ষণিক এবং তা আর কোথাও বাংলাদেশের মতো প্রকট নয়।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের আর একটি রাজ্য মাত্র নয়; এটি ভারতের বাংলাদেশ-প্রবেশদ্বার। দেশটির সঙ্গে এর দীর্ঘ, উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে, এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সম্ভব করে এবং দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে। তৃণমূল শাসনের অধীনে, অভিবাসন, নাগরিকত্ব আইন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে রাজ্য সরকার ও নয়া দিল্লির মধ্যে প্রায়ই এক সূক্ষ্ম টানাপড়েন ছিল। সেই টানাপড়েন কোনো না কোনোভাবে এক ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করত। কেন্দ্রের সঙ্গে সারিবদ্ধ একটি বিজেপি সরকার অবশ্যই সেই প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিবে ।

প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো অভিবাসন। বাংলাদেশ থেকে "অবৈধ অনুপ্রবেশ"-এর বয়ানটি বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই জোর দিয়ে বলে আসছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং প্রস্তাবিত নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র মতো নীতিগুলি এই বয়ানের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজ্য সরকার যদি কেন্দ্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত হয়, তাহলে তা কঠোর আইন প্রয়োগের পথ সুগম করতে পারে, কথায় বলা বিষয়গুলোকে প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দিতে পারে। ঢাকার জন্য এটি কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় ধরনের উদ্বেগই বাড়ায়।

দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চোরাচালান, পাচার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়তে পারে—এই সব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ মিলে যায়। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই সামাজিক মূল্য নিয়ে আসে। সীমান্তের জনপদগুলো, যারা ইতিমধ্যেই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বাস করে, নিরাপত্তা জোরদার করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমান্তের ছোটখাটো ঘটনাও দ্রুত রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডের রূপ নিতে পারে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সম্পর্কটি এক বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি করে। এক দিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার যোগাযোগের প্রকল্পগুলি (রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ জলপথ, বন্দর উন্নয়ন) দ্রুত করতে পারে, যা দুই অর্থনীতির জন্যই লাভজনক। বিশেষ করে কলকাতা–ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডর অপরিসীম সম্ভাবনা ধারণ করে। অন্যদিকে, অভিবাসন বা পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে এই অর্থনৈতিক লাভগুলি হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাণিজ্য চলে স্থিতিশীলতার উপরে ভর করে; রাজনীতি প্রায়ই তাকে বিঘ্নিত করে।

চতুর্থত, আছে উপলব্ধির প্রশ্নটি। বাংলাদেশে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নজর রাখা হয় ঘনিষ্ঠভাবে, প্রায়শই সন্দেহের চোখে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরে বিজেপির জোর ইতিমধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আরও শক্তিশালী উপস্থিতি এই উদ্বেগগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যদি নীতিগত পদক্ষেপগুলি বাংলাদেশ বা তার নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষের ধারণাকেই শক্তিশালী করে। তা আবার বাংলাদেশের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে, সেখানে ভারত-বিরোধী মনোভাব এখনও এক শক্তিশালী সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

তবে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা ভুল হবে। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক, গত এক দশক ধরে, নিরাপত্তা সমন্বয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তবসম্মত সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোগত উপাদানগুলো একদিনে উধাও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং, আরও সমন্বিত ভারতীয় রাজনৈতিক কাঠামো যা পরিকাঠামো ও বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে দিতে পারে।

আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। একটি সম্পর্ক যা অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর নির্ভরশীল কিন্তু রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, তার যত্নসহকারে পরিচালনা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এর মানে হলো, এমন একটি কৌশল নেওয়া যা না অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল, না উদাসীন। বাংলাদেশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে, পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ফলাফল গঠনে রাজ্য-স্তরের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেও স্বীকার করে নিতে হবে।

বিজেপির জন্যও চ্যালেঞ্জটি সমান তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী সাফল্য বাড়তি প্রত্যাশা বয়ে আনে। পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা যেখানে রাজ্যের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রতিরোধের ইতিহাস রয়েছে, অবশ্যই দলটির সক্ষমতার পরীক্ষা নেবে; তারা প্রচারণার প্রতিশ্রুতিগুলিকে টেকসই শাসনে রূপ দিতে পারে কিনা। যেসব শক্তি তাদের ক্ষমতায় এনেছে—বিদ্বেষমূলক ভোট, মেরুকরণ এবং উচ্চ প্রত্যাশা—সময়ের ব্যবধানে সেগুলিই তাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারে।

গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি ধারা আছে যা বিজয়ীদের বিনীত করে দেয়।

শেষ পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে তা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি একটি বড় রাজনৈতিক সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়: কোনো আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়, কোনো জোট অটল নয়। ভোটারদের মন বদলায়, বয়ান বদলায়, আর ক্ষমতা হাতবদল হয়। বিজেপির এই জয় একইসঙ্গে একটি চূড়ান্ত পরিণতি ও একটি সূচনা—এক দশকব্যাপী রাজনৈতিক প্রকল্পের চূড়ান্ত পরিণতি, এবং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা যার ফলাফল এখনও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার কিন্তু জটিল। ভূগোল দূরত্বের সুযোগ দেয় না; রাজনীতি সতর্কতা দাবি করে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান আগামী দিনগুলোতে সম্পৃক্ততার পরিসীমা নির্ধারণ করবে। এটি সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায় নাকি সহযোগিতার—অথবা আরও সম্ভাবনাময়, উভয়ের এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ ঘটাবে—তা নির্ভর করবে নির্বাচনের উপর না, বরং তার ফলাফলগুলি কীভাবে সামলানো হয় তার উপর। ইতিহাস, সর্বোপরি, কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং তা কেবল পাতা উল্টায়।

লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। 

   এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :

১. সময়ের আলো, ঢাকা : ০৬ মে,২৬

২. আজকের সংবাদ, ঢাকা : ০৬ মে,২৬

No comments:

Post a Comment