এম এ হোসাইন,
সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে একটি চিরন্তন সত্য আছে: যে পথ নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। রোমান সাম্রাজ্য তার সড়কপথের মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সমুদ্রপথ ও সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। জিব্রাল্টার, সুয়েজ কিংবা সিঙ্গাপুর কেবল মানচিত্রের কিছু বিন্দু ছিল না; এগুলো ছিল বৈশ্বিক শক্তির নিয়ন্ত্রক।
একবিংশ শতাব্দীতে সেই বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু মূল নীতিটি বদলায়নি। যুদ্ধজাহাজের জায়গা নিয়েছে সাবমেরিন কেবল, সামরিক ঘাঁটির জায়গা নিয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, আর সাম্রাজ্যের নতুন সীমানা তৈরি হচ্ছে ডেটা করিডোর ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবীতে যোগাযোগ ও সংযোগ অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো নয়; এটি ক্রমশ এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবাহ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। ফলে এখানে প্রতিযোগিতা আর কেবল ভূখণ্ড নিয়ে নয়; বরং অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং সংযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক নিয়ে।
বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা বিমানবাহী রণতরীর কথা প্রায়ই আসে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন যে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আসলে সমুদ্রের হাজার মিটার নিচে শুয়ে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৫ শতাংশই এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন, কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা এই ক্যাবলগুলোর উপর নির্ভরশীল। আমরা যখন মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠাই বা অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর করি, তখন সেই তথ্যের বড় অংশই সমুদ্রতলের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক দিয়ে ভ্রমণ করে। এই কারণেই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক ঘটনা এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। গত ২০২২ সালে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে উত্তর ইউরোপে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট প্রবাহে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দেয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে যে আধুনিক বিশ্ব কতটা ভঙ্গুর এক অবকাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রাষ্ট্র এই সংযোগ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধাই পায় না; বরং কৌশলগত সুবিধাও অর্জন করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বেইজিং শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করছে না; বরং ভবিষ্যতের তথ্যপ্রবাহের মানচিত্র গঠনেও ভূমিকা রাখছে।
ইতিহাসের প্রতিটি যুগে বন্দর ছিল শক্তির প্রতীক। ভেনিসের উত্থান, ব্রিটেনের সামুদ্রিক আধিপত্য কিংবা আমেরিকার বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রভাব—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সমুদ্রপথ।
আজও সেই বাস্তবতা অপরিবর্তিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে সাধারণত উন্নয়ন ও অবকাঠামো কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। হাম্বানটোটা, গোয়াদর, জিবুতি কিংবা পিরিয়াস—এসব বন্দর কেবল বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়; এগুলো একটি বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্কের অংশ।
সমালোচকেরা একে কখনো কখনো “ঋণ কূটনীতি” বলে অভিহিত করেন। যদিও বিষয়টি বাস্তবে আরও জটিল। অনেক উন্নয়নশীল দেশ উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন চেয়েছে, আর চীন সেই সুযোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এর ফলে যে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা এই বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বন্দরের পরিচালনা চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠে—অবকাঠামো বিনিয়োগ কোথায় শেষ হয় এবং কৌশলগত প্রভাব কোথায় শুরু হয়?
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মালাক্কা প্রণালী এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় ৪০% সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করে। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বেইজিং বিকল্প বন্দর, স্থলপথ এবং নতুন করিডোর তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারতও নিজস্ব কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ইরানের চাবাহার বন্দর, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন, মালদ্বীপ ও ওমানে অংশীদারিত্ব—সবই একই উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এটি মূলত যোগাযোগ পথগুলোর উপর প্রভাব বজায় রাখার প্রতিযোগিতা।
এক সময় ভৌগলিক সীমানা ছিল রাষ্ট্রশক্তির প্রধান পরিমাপক। পরে শিল্পায়ন ও অর্থনীতি সেই ধারণাকে বিস্তৃত করে। এখন ডিজিটাল অবকাঠামো সার্বভৌমত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্লাউড সার্ভার, ফাইভ জি নেটওয়ার্ক এবং ডেটা সেন্টারগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত অসংখ্য কার্যক্রম এগুলোর উপর নির্ভরশীল।
ইউক্রেন যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
চীন তাই নিজস্ব বৃহৎ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও বিকল্প অবকাঠামো জোট গড়ার চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষই বুঝেছে যে ভবিষ্যতের শক্তি কেবল স্থল, নৌ ও আকাশে নয়; বরং মহাকাশ এবং সাইবার জগতেও নির্ধারিত হবে। ডেটা আজকের যুগের নতুন খনিজ তেল—এই কথাটি প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবকাঠামো, যার মাধ্যমে ডেটা প্রবাহিত হয়। কারণ তথ্যের পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তথ্যকেও প্রভাবিত করা যায়।
অনেকেই মনে করেন ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন কিংবা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ। বাস্তবে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও গভীরে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে—সংযোগব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।
কার তত্ত্বাবধানে বন্দর থাকবে, ক্যাবল থাকবে, স্যাটেলাইট থাকবে এবং ডেটা সেন্টার থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দশকের ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল সেই প্রতিযোগিতার প্রধান মঞ্চ। এখানকার সমুদ্রপথ, বন্দর, ক্যাবল এবং ডিজিটাল করিডোর শুধু বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে অবকাঠামোকে নিরপেক্ষ বলে ধরে নেওয়া। ইতিহাস দেখায়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একসময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ অর্জন করে। নির্ভরশীলতার জন্য নির্মিত সংযোগব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না; বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
এই কারণেই সার্বভৌমত্বের ধারণা বদলে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এখন শুধু তার মানচিত্রে আঁকা সীমান্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয় সে কতটা স্বাধীনভাবে তার বাণিজ্য, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্রগুলো এই বাস্তবতা দ্রুত উপলব্ধি করবে, তারাই ভবিষ্যতের নিয়ম নির্ধারণ করবে। আর যারা করবে না, তারা হয়তো একদিন আবিষ্কার করবে যে তাদের ভূখণ্ড অক্ষত আছে, পতাকা উড়ছে, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক আগেই অন্য কারও নির্মিত নেটওয়ার্কের মধ্যে বন্দি হয়ে গেছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা : ৮ জুন, ২৬
No comments:
Post a Comment