এম এ হোসাইন,
কিছু কিছু মুহূর্ত আছে, যখন একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কূটনৈতিক কৌশল থাকে না—তা স্মৃতি, ইতিহাস এবং নৈতিকতার কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গাজায় স্থিতিশীলতার জন্য ট্রাম্প কতৃক প্রস্তাবিত তথাকথিত “আন্তর্জাতিক বাহিনী”-তে বাংলাদেশ সেনা পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ নিছক একটি কূটনৈতিক ভুল নয়; এটি এক গভীর নৈতিক ব্যর্থতা যা অপ্রয়োজনীয়, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন।
বাংলাদেশ কোনো গোল টেবিলের বৈঠকে জন্ম নেয়নি। আমাদের রাষ্ট্রের জন্ম এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যার মূল্য দিতে হয়েছে লাখো প্রাণ দিয়ে। গ্রাম পুড়েছে, মানুষ উৎখাত হয়েছে, একটি জাতি দখলদারিত্বের নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। আজ গাজায় আমরা যা দেখছি—অবৈধ দখল, অবরোধ, সমষ্টিগত শাস্তি, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি—তা কোনো দূরবর্তী ট্র্যাজেডি নয়; বরং আমাদের নিজেদের ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি। এই তুলনা আবেগপ্রবণ নয়, কাঠামোগত। “স্থিতিশীলতা”-র নামে এমন এক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যা বাস্তবে দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়, মানে নিজের জন্মকথাই ভুলে যাওয়া। এই সরকার ঠিক সেটাই করছে—ভুলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, একটি নৈতিক বাস্তবতা। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মুসলমান ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং নৈতিকভাবে সমর্থক। এই সমর্থন কেবল কোনো ধর্মীয় চেতনা থেকে আসে না; আসে ঐতিহাসিক সহমর্মিতা থেকেও। ফিলিস্তিনিদের কষ্ট বাংলাদেশের মানুষের কাছে দূরের গল্প নয়। চেকপোস্টের জায়গায় কারফিউ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বাড়িঘরের জায়গায় পোড়া গ্রাম—এই দৃশ্য আমাদের অপরিচিত নয়। অথচ এই ব্যাপক জনমতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইউনূস সরকার বেছে নিয়েছে তোষণ—বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের তোষণ, যে প্রশাসন কার্যত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উপপত্নী। নেতানিয়াহু আজ বিশ্বজুড়ে সমালোচিত, আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত, এবং ফিলিস্তিনিদের উপর নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কুখ্যাত। এমন এক শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানে দেশের মানুষের নৈতিক অনুভূতিকে প্রকাশ্যভাবে অস্বীকার করা।
এখানে তথাকথিত “স্থিতিশীল বাহিনী”র প্রকৃতি বোঝা জরুরি। স্থিতিশীলতা কাদের জন্য? ধ্বংসস্তূপে পরিণত এক জনগোষ্ঠীর জন্য, নাকি দখলদার শক্তির জন্য, যারা আন্তর্জাতিক বৈধতার আবরণ খুঁজছে? ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক “স্থিতিশীলতা” ধারণা বরাবরই লেনদেনভিত্তিক, নাটকীয় এবং নিষ্ঠুর। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার ছাড়াই দখলকে স্বাভাবিক করা থেকে শুরু করে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রকাশ্য সমর্থন—ফিলিস্তিন প্রশ্নে ট্রাম্পের নীতি কখনোই শান্তির ছিল না; ছিল মুছে ফেলার। সেই কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশি সেনা পাঠানো মানে শান্তিরক্ষা নয়, বরং মানবিকতার ভাষাকে প্রহসনে পরিণত করা।
এই সিদ্ধান্তকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সরাসরি বিচ্ছেদ। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত—গণতান্ত্রিক সরকার হোক বা সামরিক শাসন—বাংলাদেশ কখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটি কোনো আদর্শিক একগুঁয়েমি ছিল না; ছিল নীতিগত ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ জানত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আগে দখলকে স্বীকৃতি দিলে অন্যায়ই শক্ত হয়। আজ সেই ঐতিহ্য সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই, জনমত উপেক্ষা করে, ওয়াশিংটনের করিডোরে ফিসফিস করা আশ্বাসের মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি- বৈধতা।
ইউনূস সরকার নির্বাচিত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হলো নির্বাচন পরিচালনা করা, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দিকগুলো স্থিতিশীল রাখা—রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বিক্রি করা নয়। তারা অভিভাবক, মালিক নয়। বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিস্ফোরক সংঘাতে বাংলাদেশ সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। এর কম কিছু হলে তা নীতি নয়—দুঃসাহস। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—ওয়াশিংটনকে খুশি করতে এই তাড়াহুড়ো কেন?
উত্তরটি অস্বস্তিকর হলেও এড়ানো যায় না। বিষয়টি গাজা নিয়ে নয়; এটি ইউনুস সরকারের নিরাপধ প্রস্থান পরিকল্পনা নিয়ে। অনির্বাচিত সরকার জানে ইতিহাস তাদের প্রতি সদয় হয় না। তারা বোঝে, আইনের পোশাক পরে একসময় জবাবদিহি আসবেই। মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে নিজেকে জুড়ে দিলে আন্তর্জাতিক বৈধতা মেলে, সুরক্ষা মেলে, এবং প্রয়োজনে নিরাপদ প্রস্থানও নিশ্চিত হয়। সেই হিসাবে গাজা হয়ে ওঠে দরকষাকষির মুদ্রা, আর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যেন এক লেনদেনের বস্তু।
এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রতীকী নয়; তা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে সহায়তা বন্ধ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। প্রবাসী শ্রমবাজার সংকুচিত হলে তার ধাক্কা পড়বে রেমিট্যান্সে, পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে। পররাষ্ট্রনীতি শূন্যতার মাঝে পরিচালিত হয় না; এটি বিমানবন্দর, রেমিটেন্স চ্যানেল এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
সরকারের মাঝে কেউ কেউ পরিচিত এক তুলনা টানছেন—পাকিস্তান। যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা নাকি স্থিতিশীলতা ও তহবিল নিশ্চিত করে। ঠিক এই পথটাই বাংলাদেশের এড়িয়ে চলা উচিত। মার্কিন সামরিক সহায়তার উপর নির্ভরতা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব শক্ত করেনি; বরং ফাঁপা করেছে। চরমপন্থা, ঋণ ও কৌশলগত ভাড়াটিয়ার চক্রে পড়ে পাকিস্তান আজ টিকে থাকার জন্যই আমেরিকার উপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক অবস্থান আলাদা। আমাদের এমন কোনো অস্তিত্ব সংকট নেই, যা বিদেশি সামরিক পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করে। ওয়াশিংটনের হাতে নৈতিক দিকনির্দেশনা তুলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। পাকিস্তানের ব্যর্থতা নকল করা বাস্তববাদ নয়—দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
এখানে সেনাবাহিনীর প্রশ্নও আছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সেনারা নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছে। গাজা সেই নিরপেক্ষতা দেয় না। বর্তমান প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে পাঠানো বাহিনী শান্তিরক্ষী নয়, বরং দখলদারিত্বের সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শুধু এই ধারণাটুকুই একটি পেশাদার বাহিনীর সুনাম ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে যথেষ্ট।
তাছাড়া, দেশের অভ্যন্তরে এই স্বীদ্ধান্তটি চরম বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি করবে। আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে এধরনের হটকারিতায় জাতি এক গভীর রাজনৈতিক খাদের কিনারায় পৌঁছে যেতে পারে। আমাদের ঐতিহাসিক ও ঐক্যবদ্ধ চেতনাকে কিছু পশ্চিমা মদদপুষ্ট লোকের স্বীদ্ধান্তের জন্য নত হবে, সেটা মনে করাটা কেবলই দিবাস্বপ্নই নয়, রীতিমতো এক জংলী স্বপ্ন। এসব দেখে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এটা আবার ইউনুস সাহেবের 'মেটিকুলাস' পরিকল্পনার অংশ নয়তো?
পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত দীর্ঘ ছায়া ফেলে। প্রেস বিজ্ঞপ্তির শব্দ মুছে যায়, কিন্তু অবস্থান থেকে যায়। বাংলাদেশ একসময় নিপীড়িতের পাশে দাঁড়িয়েছিল—ফ্যাশনের জন্য নয়, পরিচিতির কারণে। গাজায় তথাকথিত স্থিতিশীলতা বাহিনীতে আগ্রহ প্রকাশ সেই পরিচিতি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্র নৈতিক বিস্মৃতির বিলাসিতা করতে পারে না। একটি অন্তর্বর্তী সরকার ইতিহাসের সঙ্গে বাণিজ্য করার অধিকার রাখে না। গাজার মানুষের আরেকটি বাহিনী দরকার নেই, যারা অন্যায়কে জমাট বাঁধিয়ে রাখবে। আর বাংলাদেশের দরকার নেই নিজের গল্পের ভুল পাশে দাঁড়িয়ে প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করার। ইতিহাস এই মুহূর্তকে বিচার করবে। প্রশ্ন শুধু এটুকু—সে বিচারে বাংলাদেশ নিজেকে চিনতে পারবে, নাকি বিস্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাবে।
লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. আলোকিত বাংলাদেশ, ঢাকা : ১৩ জানুয়ারী, ২৬
No comments:
Post a Comment