এম এ হোসাইন,
আমরা আন্তর্জাতিক যুদ্ধের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি যেখানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেই যুদ্ধ কীভাবে এগোতে পারে। যেমন বিমানবাহী রণতরী এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে সরে যায়; বিশ্বজুড়ে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে অপ্রয়োজনীয় জনবল সরিয়ে নেওয়া হয়, কিংবা কূটনীতিকদের তৎপরতা বাড়ে, যদিও স্পষ্টতা সেখানে খুব কমই থাকে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মোতায়েন এই প্রবণতারই এক পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ।
পেন্টাগন তার খেলার ছক নতুন করে সাজিয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট ‘পাঠ্যপুস্তকীয় কৌশল’ অনুসরণ করছে। এই মুহূর্তে মূল প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরানে আঘাত হানবে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কেন আঘাত হানবে? আর সেই আঘাতের শেষ লক্ষ্য কী?
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির সবচেয়ে স্পষ্ট নিদর্শনগুলোর মধ্যে হলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সামরিক সম্পদের নড়াচড়া। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ অবস্থান করছে; প্যাট্রিয়ট ও থাড এর মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। সৌদি আরব ও কাতারের মতো অগ্রবর্তী ঘাঁটি থেকে অপ্রয়োজনীয় সব কর্মী প্রত্যাহার করা হচ্ছে; এবং ঐ অঞ্চলে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার ও ভারী পরিবহন বিমান পাঠানো হয়েছে। এসবের কোনোটিই কূটনৈতিক সমাধানের প্রত্যাশার ইঙ্গিত দেয় না। বরং এগুলো বলে দেয়—একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করছে সামরিক সংঘাতের জন্য।
ইরানও এই পরিস্থিতির মধ্যে নিষ্ক্রিয় ছিল না। বরং সক্রিয় প্রস্তুতি নিয়েছে। রাশিয়া ও চীন থেকে ইরানে যে অস্ত্রের প্রবাহ দেখা যাচ্ছে, তা কোনো আকস্মিকতা নয়; বরং প্রত্যাশিতই ছিল। একই সঙ্গে ইরান অস্ত্র মজুত বাড়িয়েছে এবং চীনের এইসকিউ-৯বি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নত করেছে। তবে, কাগজে-কলমে এসব সক্ষমতা বেশ চমকপ্রদ মনে হলেও বাস্তবে আধুনিক হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে এগুলো যথেষ্ট নয়।
বর্তমান আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজন হলো গভীর সমন্বয় - নানা ধরনের ব্যবস্থা এবং এদের মাঝে সার্বক্ষণিক রিয়েল টাইমে যোগাযোগ। এসবের অনেকটাই ইরানের হাতে নেই। তাছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার সবচেয়ে দুর্বল সেন্সরের মতোই শক্তিশালী হয়—আর ইরানের সেন্সর নেটওয়ার্কে দুর্বলতার অভাব নেই।
তবু এসব ব্যাখ্যা যুদ্ধের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে না। ইরানের ভেতরে যে বিক্ষোভ চলছে—যতই তা বাস্তব ও প্রাণঘাতী হোক—ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশে তা মূল বিষয় নয়। ইরানি গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ আগ্রহ বিশ্বাসযোগ্য ঠেকে না, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতীত রেকর্ডের আলোকে। ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বিপর্যয়ের প্রতি তার উদাসীনতা, ইউক্রেন কিংবা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি—সবই তার প্রমাণ। এটি উদার মূল্যবোধের কোনো ক্রুসেড নয়; এটি অসমাপ্ত হিসাব চুকানোর চেষ্টা।
এই হিসাবের সূত্রপাত পূর্বের সংঘাতে। তখনকার মার্কিন হামলায় প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম, ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হদিস মেলেনি। তেহরান আগেভাগেই তা সরিয়ে নিয়েছিল। এই ইউরেনিয়াম যদি আরও সমৃদ্ধ করা হয় (যা প্রযুক্তিগতভাবে খুব কঠিন কাজ নয়) তাহলে তা কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান জোগাতে পারে। যতক্ষণ এই ইউরেনিয়ামের অবস্থান অজানা থাকবে, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের কিংবা এর সহচর ইসরায়েলের চোখে সমস্যার নিষ্পত্তি হবে না।
ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে সময় কিনতে চেয়েছে। কিন্তু শর্ত বদলে গেছে। এখন ওয়াশিংটনের দাবি শুধু সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা নয়; বিদ্যমান পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়া এবং আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনী ত্যাগ করাও। এমন শর্তে সম্মত হলে কোনো ইরানি সরকার (ধর্মীয় হোক বা অন্য) টিকে থাকতে পারবে না। ফলে আবার ফিরে আসে শক্তির প্রশ্ন।
মোটের উপর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ইরানে আঘাত হানবার জন্য তিনটি সামরিক বিকল্প পথ রয়েছে। প্রতিটির ঝুঁকি ও পরিণতি আলাদা।
প্রথমটি হলো পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা। এটি সবচেয়ে সীমিত এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিকল্প পথ। স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা, সম্ভব হলে হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, তারপর ‘মিশন সম্পন্ন’ ঘোষণা করা। এ ধরনের অভিযানে বি-৫২ বোমারু বিমানের ওপর ভরসা করতে হবে, যেগুলো জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার-বাস্টার বহন করতে সক্ষম। এটি ইরানের গভীরে ভূগর্ভস্থ্য স্থাপনায় আঘাত হানার একমাত্র কার্যকর অস্ত্র। অভিযানটি হবে সংক্ষিপ্ত, তীব্র এবং সর্বোপরি সীমিত আকারের।
দ্বিতীয় বিকল্প হলো শীর্ষ নেতৃত্ব ‘হত্যা’—ইরানের শীর্ষ নেতা বা আইআরজিসির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে আঘাত, যাতে শাসনব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ে। ধারণাটি আকর্ষণীয়: মাথা কেটে দিলে শরীর ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গভীর ও শক্তিশালী; বিপ্লবী গার্ডের উত্তরাধিকার ও নিয়ন্ত্রণের বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানিদের বিশ্বাস, একজন নেতাকে হত্যা করলে তিনি শহীদে পরিণত হন। ফলে, ইতিহাস এখানে সতর্ক করে। ১৯৮০ সালের ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ ব্যর্থ হয়েছিল ইরানি প্রতিরোধে নয়, বরং অতিরিক্ত লজিস্টিক আত্মবিশ্বাসে। ইরানের ভূপ্রকৃতি অহংকারকে শাস্তি দেয়।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এ ধরনের হত্যাভিত্তিক হামলা যে বিভাজন ঘটাতে চায়, উল্টো সেই ঐক্যই তৈরি করতে পারে। শিয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি শহীদ তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত। বাইরের আঘাত সাধারণত কঠোরপন্থীদের শক্তিশালী করে, মধ্যপন্থীদের নয়। ২০০৩ সালে বাগদাদের পর থেকে আকাশপথে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর ধারণা ভালোভাবে টেকেনি।
তৃতীয় বিকল্পটি সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক। এটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযান, যার লক্ষ্য ইরানের সামরিক শক্তি, নিরাপত্তা কাঠামো ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা। কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে আইআরজিসির অবকাঠামো, কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইউনিটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। উদ্দেশ্য—এমন এক ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করা, যাতে নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ বা পতনে বাধ্য হয়।
এটি অসম্ভব নয়। কিন্তু ব্যয়বহুল। হুমকির মাত্রা অনুযায়ী
ইরান অবশ্যই এর প্রতিক্রিয়া জানাবে। নিম্ন পর্যায়ে তারা ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় আঘাত বা হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। উচ্চ পর্যায়ে—যদি তারা মনে করে শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বই ঝুঁকিতে—তবে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যেখানে উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িয়ে পড়বে।
ইসরায়েলের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাদের স্বার্থ সীমিত, কিন্তু তীক্ষ্ণ। ইরানের শাসনব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়, ইসরায়েলি জেটগুলো স্পষ্টতার অপেক্ষা করবে না। তারা ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসে ঝাঁপাবে—যেমনটি তারা আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় করেছিল। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে, এমন মুহূর্ত ক্ষণস্থায়ী এবং কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের।
সবশেষে ফিরে আসি মূল সমস্যায়: কৌশল। ধোঁয়া কাটলে ওয়াশিংটন কী চায়? বিলম্বিত পারমাণবিক কর্মসূচি? দুর্বল শাসনব্যবস্থা? নতুন সরকার? একটা স্পষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে, সামরিক অভিযান আসল কাজ না করে শুধু ক্ষমতা দেখানোর উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ইরান প্রশ্নে প্রয়োজন অতিরিক্ত সংযম। হয়তো ফিউজ জ্বলছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, যুদ্ধ কীভাবে শুরু হলো তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা কীভাবে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। আর সেই প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অবস্থান আজও বিস্ময়করভাবে অস্পষ্ট।
লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা : ০১ ফেব্রুয়ারী, ২৬
২. দেশ রূপান্তর, ঢাকা : ০১ ফেব্রুয়ারী, ২৬
৩. সময়ের আলো, ঢাকা : ০২ ফেব্রুয়ারী, ২৬
No comments:
Post a Comment