এম এ হোসাইন,
ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রণক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রযুক্তি কেবল একটি যন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, রাষ্ট্রের আচরণ এবং যুদ্ধের চরিত্র বদলে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে মেশিনগানকে অনেকে কেবল দ্রুত গুলি ছোড়ার একটি কার্যকর অস্ত্র বলে মনে করেছিল। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি ইউরোপের যুদ্ধনীতিকে বদলে দেয়। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের কাদামাখা ট্রেঞ্চে একটি পুরো প্রজন্মের মৃত্যু সেই পরিবর্তনের নির্মম মূল্য হয়ে দাঁড়ায়।
পারমাণবিক বোমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। যুক্তি ছিল—এটি যুদ্ধ শেষ করবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা হলো পৃথিবী প্রবেশ করল এক দীর্ঘ ভয়ের যুগে, যেখানে পরস্পরকে ধ্বংস করার সক্ষমতাই হয়ে উঠল বৈশ্বিক স্থিতাবস্থার ভিত্তি। আজও বিশ্ব রাজনীতি সেই আতঙ্কের ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
এখন মানবসভ্যতা আরেকটি পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এবার প্রযুক্তিটির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর ভবিষ্যতের কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়; ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। বাস্তব মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তে অ্যালগরিদম ভূমিকা রাখছে। কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হবে, কোন গাড়ি সন্দেহজনক, কোথায় সম্ভাব্য শত্রু লুকিয়ে আছে—এসব নির্ধারণে এখন এআই কাজ করছে মানুষের আগেই।
প্রশ্নটা তাই আর এই নয় যে, এআই যুদ্ধ বদলে দেবে কি না? সেটি ইতোমধ্যেই বদলে দিচ্ছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—আমরা কি বুঝতে পারছি যুদ্ধের চরিত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই পরিবর্তনের জন্য কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ আদৌ সম্মতি দিয়েছে কি?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ‘প্রজেক্ট মেভেন’-এর সূচনা হয়েছিল খুব বাস্তব একটি সমস্যার কারণে। আফগানিস্তান, ইরাক কিংবা সিরিয়ার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন থেকে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ ভিডিও ও নজরদারি তথ্য আসছিল যে মানব বিশ্লেষকদের পক্ষে সেগুলো সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, ভুল হতো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেত।
তখন ধারণা এল—মানুষের চোখের চাপ কমাতে কিছু কাজ এআইকে দেওয়া হোক। মোটরসাইকেলের গতিবিধি শনাক্ত করা, সন্দেহজনক চলাচল পর্যবেক্ষণ করা কিংবা নির্দিষ্ট আচরণের ধরণ চিহ্নিত করার মতো কাজ যন্ত্র করবে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মানুষ। শুনতে বেশ যুক্তিসঙ্গত। ইতিহাসে প্রায় সব সামরিক প্রযুক্তিই এভাবেই শুরু হয়েছে—একটি সীমিত ব্যবহার এবং বাস্তবসম্মত একটি ব্যাখ্যা দিয়ে।
কিন্তু প্রযুক্তির একটি নিজস্ব গতি আছে। একবার কোনো ব্যবস্থাকে কার্যকর বলে প্রমাণ করা গেলে সেটি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দিনে শত শত নয়, হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলছে, ভবিষ্যতে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল যুক্ত হলে সেই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
সমস্যা এখানেই। একজন মানুষ হয়তো দিনে পঞ্চাশটি ছবি গভীর মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু যখন দিনে পাঁচ হাজার লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করা হবে, তখন মানুষের ভূমিকা আসলে কতটুকু থাকে? “হিউম্যান ইন দ্য লুপ” বা “চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের উপস্থিতি”—এই পরিভাষাটি এখন অনেক সময় বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তার চেয়ে রাজনৈতিক আশ্বাস হিসেবেই বেশি শোনায়। কারণ বাস্তবতা হলো, যখন গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং মেশিনের অনুমোদনদাতা হয়ে দাঁড়ায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস একবার বলেছিলেন, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সক্ষমতা কখনোই কৌশলের বিকল্প নয়। এই কথাটি আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সেটি নিজে বলে দিতে পারে না—যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, সেই লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে কি না, কিংবা যুদ্ধ আদৌ পরিস্থিতিকে ভালো করছে কি না।
ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর যুদ্ধ চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এই কঠিন বাস্তবতা বুঝেছিল। সামরিকভাবে অসংখ্য সফল অভিযান চালানো সম্ভব, কিন্তু তাতে রাজনৈতিক বিজয় নিশ্চিত হয় না। এখন এআই সেই পুরোনো ভুলকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি তৈরি করছে। গতি ও নির্ভুলতাকে কৌশলগত প্রজ্ঞা বলে মনে হওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানগুলো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কয়েক দিন থেকে কয়েক সেকেন্ডে নামিয়ে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর ফলে রাজনৈতিকভাবে কী অর্জিত হয়েছে? ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। আঞ্চলিক বাস্তবতায় নাটকীয় কোনো পরিবর্তনও আসেনি। অর্থাৎ প্রযুক্তি দ্রুত কাজ করেছে, কিন্তু কৌশলগত ফলাফল স্পষ্ট নয়।
বেসামরিক মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যুদ্ধের ইতিহাসে ভুল হামলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এআই যুগে একটি ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটছে—মানবিক বিপর্যয়কে প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো স্কুলে হামলা হলে বা নিরীহ মানুষ মারা গেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, “অ্যালগরিদম ঠিকভাবে প্রশিক্ষিত ছিল কি না” অথবা “ডেটা সঠিকভাবে লেবেল করা হয়েছিল কি না।” এখানে মানুষের মৃত্যু যেন ধীরে ধীরে সফটওয়্যারের ‘বাগ’-এ পরিণত হচ্ছে।
এই মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যুদ্ধের আইন, বেসামরিক সুরক্ষা কিংবা অনুপাত রক্ষার মতো নীতিগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এসব নীতির জন্ম হয়েছে। এগুলো দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে টেকসই যুদ্ধ পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত।
তবে এআই ব্যবহারের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিও রয়েছে, যা অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল তথ্য, ক্লান্তি এবং বিভ্রান্তির কারণে “ফ্রেন্ডলি ফায়ার” বা নিজেদের সৈন্যদের ভুলবশত হত্যা করার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। যদি এআই সত্যিই এসব ভুল কমাতে পারে, তাহলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে। প্রজেক্ট মেভেনের পেছনে কাজ করা অনেক সেনা কর্মকর্তা আসলে যুদ্ধকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও কম প্রাণঘাতী করতে চেয়েছিলেন। সমস্যা হলো, প্রযুক্তি খুব কম ক্ষেত্রেই নিজের মূল সীমার মধ্যে থাকে।
শুরুতে যে এআই কেবল মোটরসাইকেল শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আরও বড় সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে। কোনো এলাকায় কতজন বেসামরিক মানুষ থাকতে পারে—এ ধরনের অনুমানেও এআই ব্যবহারের চিন্তা শুরু হয়েছিল। যদিও শুরুতে অনেক কর্মকর্তা দ্বিধায় ছিলেন, কারণ মেশিনের অনুমানের ওপর নিজের দায়িত্ব নিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুততার চাপ এবং সামরিক প্রতিযোগিতার মধ্যে সেই সতর্কতা শেষ পর্যন্ত কতদিন টিকে থাকবে?
এই জায়গায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। তাদের ‘ডেল্টা’ সিস্টেম যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য দ্রুত সমন্বয় করতে সাহায্য করছে, কিন্তু চূড়ান্ত হামলার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মানুষের হাতেই থাকছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহ করছে, কিন্তু হত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। এই মডেলটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, এআই ব্যবহারের একমাত্র পথ স্বয়ংক্রিয় হত্যাযন্ত্র তৈরি করা নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা অবশ্য প্রযুক্তিগত নয়, রাজনৈতিক। এআই-নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো বড় বিতর্ক হয়নি। কংগ্রেসে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি। ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হয়নি, তারা আদৌ এমন যুদ্ধব্যবস্থাকে সমর্থন করে কি না। ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি প্রায়ই গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার চেয়ে দ্রুত এগোয়। ড্রোন যুদ্ধও প্রথমে নীরবে বিস্তৃত হয়েছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক কাঠামো পরে এসেছে, প্রযুক্তি আগে। এআই সেই পুরোনো ধারা আরও দ্রুত গতিতে পুনরাবৃত্তি করছে।
সবশেষে প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, মানুষের। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কি ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমের হাতে চলে যাচ্ছে? যুদ্ধ কি এমন এক যান্ত্রিক গতিতে পরিচালিত হবে, যেখানে রাজনৈতিক বিবেচনা, মানবিক দ্বিধা কিংবা নৈতিক চিন্তার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে? সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো—এই পরিবর্তনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ সিদ্ধান্ত নেয়নি। কোনো জনগণ ভোট দেয়নি। কিন্তু পরিবর্তন তবুও ঘটছে।
আর ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, যুদ্ধের চরিত্র বদলে গেলে তার পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত সেটি পুরো সভ্যতার উপর প্রভাব ফেলে।
লেখক : প্রাবন্ধিক।
এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে :
১. দৈনিক সংবাদ, ঢাকা : ২৬ মে,২৬
২. আজকের সংবাদ, ঢাকা : ২৬ মে, ২৬
No comments:
Post a Comment